বাচ্চাদের ঘুমের অভ্যস ঠিক করার ৫টি সহজ উপায়

Posted by Mohammed . on

বাচ্চাদের ঠিক কতটুকু ঘুম প্রয়োজন?

মাসখানিক বয়সী শিশুদের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল তাদের ঘুমকাতরতা। প্রত্যেক বাচ্চার ঘুমের একটি নির্দিষ্ট রুটিন থাকে যা সবার ভিন্ন হয়। কিছু বাচ্চা দিনের বেলা বেশি ঘুমায় এবং রাতে তার ঘুম হয় হালকা। আবার কিছু বাচ্চা হয় ঠিক তার উল্টো।

নয় মাস বয়স হওয়ার আগ পর্যন্ত বাচ্চাদের দিনের বেলা অন্তত তিন ঘন্টা ঘুম হওয়া উচিত। অধিকাংশ বাচ্চা সাধারণত সকালের দিকে অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে থাকে এবং মধ্যদুপুরে আরও কিছুক্ষণ ঘুমায়। নয় থেকে বার মাস বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে নিয়মিত ঘুমের পরিমাণ প্রথম নয় মাসের চেয়ে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। 

বাচ্চাদের ঘুমের রুটিন পরিবর্তন করতে চাইলে প্রথমে তাদের বর্তমান রুটিন খেয়াল করতে হবে এবং সে অনুযায়ী ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনতে হবে। যদি তার ঘুমের সময় এগিয়ে রাত ৮টায় আনতে হয়, তবে খেয়াল রাখতে হবে সে যেন বিকাল ৪টার পর থেকে আর না ঘুমায়।

রাতের ঘুম গভীর করতে চাইলে খেয়াল রাখতে হবে যেন তার দুপুরের ঘুম খুব দীর্ঘ না হয়। তার জন্য নির্দিষ্ট ঘুমের নিয়ম করার ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যেন ঘুমের সময়ের আগে সে বেশ কয়েক ঘন্টা জেগে থাকে এবং খেলাধুলা করে। এতে তার ক্লান্তি সৃষ্টি হবে এবং তার ঘুম গভীর হবে। ঘুমন্ত শিশুকে জাগিয়ে তোলা বেশ কঠিন এবং তা করলেও সাধারণত তাদের মেজাজ অনেকক্ষণ খিটখিটে থাকে, কিন্ত তাদের ঘুমের রুটিন ঠিক করতে চাইলে এর বিকল্প নেই।

 বাচ্চাকে ঘুমাতে কীভাবে উৎসাহিত করবেন?

বাচ্চারা সাধারণত ঘুমানোর ব্যাপারে বেশ গড়িমসি করে। কিছু কিছু পন্থা অবলম্বন করলে সহজে  বাচ্চাদের ঘুমের রুটিন তৈরি করা যাবে। আসুন তাহলে জেনে নেই ৫টি টিপসঃ

১) সারা দিন রুটিনমাফিক চলা

বাচ্চাদের দৈনন্দিন রুটিন থাকলে সে বুঝবে দিনের কোন সময় তার কোন কাজ করা উচিত। এই রুটিন বাচ্চার ইচ্ছা-অনিচ্ছা হিসেবে তৈরি করা উচিত। যেমন- দিনের কোন সময় সে বেশি ক্লান্ত থাকে, কিংবা ক্ষুধার্ত থাকে তা খেয়াল করতে হবে। কোন সময় সে খেলতে পছন্দ করে তাও বুঝতে হবে। এতে যখন ক্লান্ত অবস্থায় তাকে ঘুমানোর কথা বলা হবে, তখন সে সহজেই তা শুনবে। এক্ষেত্রে খুব কড়া নিয়ম করার প্রয়োজন হয়না। ঘড়ি ধরে সব করার প্রয়োজন হয়না। একটি নির্দিষ্ট সময়ের আশেপাশে এসব করলেই তার এই রুটিন মেনে চলার অভ্যাস হয়ে যাবে। 

বাচ্চার বয়স ছয় মাসের কম হলে তাকে নিজের কাছে রেখে ঘুম পাড়ানো ভাল যেন তার দিকে ঠিকমত নজর রাখা যায়। এতে ‘Sudden Infant Death Syndrome (SIDS)’ এর ঝুঁকি কমে যায়।

বাচ্চা ঘুমাতে থাকা অবস্থায় ঘরের কাজ গুছিয়ে নিতে চাইলে তাকে দোলনায় অথবা প্র্যামে রাখা যায়। এতে নিজের সাথে এক রুম থেকে আরেক রুমে নেওয়া সহজ হয়। যদি কোন কারণে তা সম্ভব না হয়, তবে পরিবারের কোন এক দায়িত্ববান সদস্যের কাছে রেখে কাজ গুছিয়ে নেওয়া যেতে পারে। বাচ্চাদের দোলনার সাথে লাগিয়ে রাখার মত ‘Baby Monitor’ পাওয়া যায় যা দিয়ে অন্য রুম থেকেও বাচ্চার দিকে নজর রাখা যায়।

বাচ্চার ঘুমের মধ্যে তাকে বাইরে নিয়ে যেতে চাইলে ‘baby basket’ ব্যবহার করা যেতে পারে। খেয়াল রাখতে হবে যেন অধিকাংশ সময় বাচ্চা একটি নির্দিষ্ট স্থানে ঘুমায়। যেমন- দোলনা অথবা বিছানা। Car seat শুধুমাত্র গাড়িতে থাকা অবস্থায়ই ব্যবহার করা উচিত। বাচ্চা যদি Car seat এ ঘুমিয়ে পড়ে তবে সবসময় তার নিরাপত্তার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাকে ডে-কেয়ারে দেওয়া হলে বাড়িতে যেন সে সবসময় নির্দিষ্ট জায়গায় ঘুমায় তা খেয়াল রাখতে হবে।

২) আপনার বাচ্চার সাথে কিছু একলা সময় কাটান

বাচ্চার ঘুমানোর সময়ের আগে কিছুক্ষণ গল্প বলা, বই পড়ে কিংবা গান গেয়ে শুনানো ইত্যাদির মাধ্যমে মা-বাবার সাথে তার সুন্দর বন্ধন গড়ে ওঠে। এই সময়টুকু সে উপভোগ করতে শিখে এবং ঘুমানোর সময়ের জন্য সে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে।

৩) বাচ্চা ক্লান্ত হলে ঘুম পাড়িয়ে দিন

বাচ্চারা সাধারণত যতটুকু সময় জেগে থাকে, ততক্ষণ খেলাধুলা করে কাটায়। এতে তারা ক্লান্ত হয়ে যায়। এই ক্লান্তি তাদের আচার-আচরণে প্রকাশ পায়। তারা খুব সহজে বিরক্তি প্রকাশ করে অথবা অন্যমনস্ক হয়ে যায়। এসব আচরণ দেখে বুঝতে হবে তার ঘুম আসছে।

ঘুম আসার কিছুক্ষনের মধ্যে ঘুম পাড়িয়ে ফেললে মা-বাবার জন্য কাজটি সহজ হয় কারণ তখন বাচ্চার সব মনোযোগ তার ক্লান্তির দিকে থাকে।

সঠিক পরিবেশ তৈরি করুন

বাচ্চার ঘুমানোর রুম আরামদায়ক হওয়া উচিত। সেই রুমে কোন অতিরিক্ত শব্দ না থাকাই ভাল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চা হালকা গানের শব্দে ঘুমাতে পছন্দ করে। বাইরের আলো যেন বিরক্তি সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য পর্দা টেনে রাখুন। রুম বেশি ঠান্ডা বা গরম যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এদিকে বেশি নজর দিতে হবে অতিরিক্ত গরম এবং শীতের দিনে।

রুমে যদি এ.সি. থাকে তবে তার তাপমাত্রা যেন ২২°-২৩° সেলসিয়াস এর কম না হয়।

৫) বাচ্চাকে নিজে নিজে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন

৩ মাস বয়সেই বাচ্চারা নিজে নিজে ঘুমাতে শিখে যায়। এক্ষেত্রে প্যাসিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। এসব ছাড়াও সে যদি অনেক ক্লান্ত হয় তবে নিজ থেকেই ঘুমিয়ে পড়তে পারে।

বাচ্চা সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করলেই তাকে কোলে নিয়ে শান্ত করায় ব্যস্ত হয়ে পড়ার চেয়ে তাকে কিছুক্ষন সময় দিয়ে নিজ থেকেই শান্ত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। যখন সে নিজ থেকে শান্ত হওয়া শিখবে, তখন সে নিজ থেকে ঘুমানোর ক্ষেত্রেও আগ্রহী হবে।

অনেকে নিজ থেকে ঘুমাতে দেওয়ার বিষয়টিকে ভালভাবে নাও দেখতে পারেন। এমনকি আপনার নিজেরও খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাচ্চার সুবিধার বিষয়টিই মাথায় রাখা উচিত।

বাচ্চাকে নিজ থেকে ঘুমাতে দিলে সে তার নিজের রুটিন আরও ভালভাবে রপ্ত করবে।

বাচ্চার ঘুমের সুন্দর অভ্যাস তৈরি করা সহজ নয়। এতে অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। একবার তার সুন্দর ঘুমের অভ্যাস তৈরি হয়ে গেলে তা কেবল তার নিজের স্বাস্থ্যের জন্যই ভাল নয়, তা পরিবারের সবার জন্যও কাজটি সহজ করে দেয়।